পরামর্শ দিয়েছেন

আমাতুল্লাহ শারমিন
ডায়েটিশান ও নিউট্রিশন স্পেশালিস্ট

শেয়ার এবং প্রিন্ট করুন

সুস্থ মনের জন্য দরকার পুষ্টির

পুষ্টি শুধু শারীরিক নয় মানসিক সুস্থতার জন্যও দরকার। তাই শৈশব থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি ভাল ভিত্তি গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক উপাদানগুলো পেলে মস্তিষ্ক সচল থাকে এবং বিভিন্ন জটিল প্রক্রিয়া সঠিকভাবে চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু কোন পুষ্টিগুণের ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব মস্তিষ্কেও পড়ে । স্বাভাবিকভাবেই মনের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে শিশুদের মস্তিষ্কে যেন সঠিক পুষ্টি উপাদানের অভাব না হয়- সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে বাবা-মাদের ।

ডায়েটের সাথে মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক

এখন এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস মানুষের মানসিক উন্নতির পথে বাধা
(মুড সুইংএর কারন)। খাবারের অভ্যাস কতখানি মানসিক ভারসাম্য ও স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত
করে, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে বর্তমান গবেষণা বলছে, মাইক্রোবায়োটা (অন্ত্রে থাকা জীব), নিউরোপ্লাসটিসিটি,অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ক্রনিক ইনফ্লামেশনকে ডায়েট প্রভাবিত করে।
যদিও এখনো আমাদের অনেক জানার বাকি। কিন্তু বর্তমান গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে এতটুকু বোঝা যাচ্ছে যে, স্বাস্থ্যসম্মত ডায়েট ফিজিক্যাল ও মেন্টাল হেলথ এর মতই গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে শর্করারউঠা-নামা ও অনিয়ন্ত্রিত পুষ্টিকে এজন্য দায়ী করা হয়। যেমনঃ

১। কোন বেলার খাবার বাদ দেওয়াঃ কোন বেলার খাবার না খাওয়া বিশেষত যদি সকালের নাস্তা নাখাওয়া হয়, তবে শরীরের ব্লাড সুগার কম থাকে। ফলে শরীর দুর্বল ও ক্লান্ত থাকে। ফলে মেজাজখিটখিটে হয় বা মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

২। কোন নির্দিষ্ট একটা গ্রুপের খাবার না খাওয়াঃ যদি কেউ ডায়েট এ কোন একটি গ্রুপ এর খাবারবাদ দেয় (খুবই অল্প কাড়বোহাইড্রেট বা খুবই অল্প ফ্যাট), তবে তার শরীরে কিছু পুষ্টি উপাদানেরঘাটতি হয়। যেমনঃ জিংক, আয়রন, ভিটামিন-বি, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন-ডি, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডইত্যাদি। এসব উপাদানের পরিমাণ শরীরে কম হলে তা মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

৩। রিফাইন কার্বোহাইড্রেট বা প্রসেস কার্বোহাইড্রেট বেশী খাওয়াঃ বার্গার, বান, পাউরুটি,
পেস্ট্রি, কোল্ড ড্রিঙ্কস ইত্যাদি রিফাইন কার্বোহাইড্রেট বা প্রসেস কার্বোহাইড্রেট রক্তে
গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি করে। কিন্তু এধরনের গ্লুকোজ আবার শরীর থেকে দ্রুত কমেও যায় যা মেজাজের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে ও ঘন ঘন ক্ষুধা লাগে।

মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান: 

ভিটামিন বি কমপ্লেক্স- বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভিটামিন ১২ এর পরিমাণ কম থাকা মানুষেরা বিষণ্ণতা ও ডেমেনশিয়া (স্মৃতিভংশ) রোগে বেশি ভোগেন। আর ফলেটের অভাব মন খারাপের কারণ হিসেবেও অনেক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের অন্তর্গত বিভিন্ন ভিটামিন আমাদের মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। মাছ-মাংস, দুধ, মাটির নিচের সবজি, ডাল, লাল চাল ইত্যাদি উৎস থেকে পাওয়া যায় এই প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।

ভিটামিন ডি: মানসিক রোগের সাথে ভিটামিন ডি’র সরাসরি সম্পর্ক আছে। নিউরনের যে অংশ আমাদের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, সে স্থানের রিসেপ্টরদের সচল করে ভিটামিন ডি। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণায় ভিটামিন ডি’র ঘাটতির সাথে তীব্র রকমের বিষণ্ণতা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার ও সিজোফ্রেনিয়ার সংযোগ পাওয়া গেছে। মানসিক রোগের চিকিৎসায় ভিটামিন ডি’র ব্যবহার হয়। দুধ, ডিম, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি খাবার থেকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।

আয়রন- রক্তে আয়রনের অভাব (অ্যানামিয়া) বিষণ্ণতার সাথে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়। লালশাক, মাংস, কলিজা, পালংশাক, ডাল ইত্যাদি খাবার আয়রনে সমৃদ্ধ।

ওমেগা-৩ – স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এই ফ্যাটি এসিড চিন্তা ও স্মৃতিশক্তি সবল করে, এছাড়াও মুড ভালো রাখতেও এর ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে বলে জানা যায়। দেহে ওমেগা-৩ এর অভাবে মনোযোগহীনতা ও সহজে ভুলে যাওয়ার প্রবণতার কথাও বলা হয়ে থাকে। ওমেগা-৩ এর একটি বড় উৎস হলো সামুদ্রিক মাছ।

জিংক- এই উপাদানটি দেহের উপর মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে। জিংকের অভাব বিষণ্ণতার কারণ হিসেবেও দেখা হয়। কাজুবাদাম হতে পারে জিংকের একটি আদর্শ উৎস। স্নায়ুতন্ত্রকে ভালো রাখতে বিভিন্ন গবেষক এর ভূমিকার কথা বলেছেন।

ম্যাগনেসিয়াম- এটি স্নায়ুকোষের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। স্নায়ুর নানান সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখে ম্যাগনেসিয়াম। বিভিন্ন স্ট্রেস এবং বিষণ্ণতার বিরুদ্ধে মস্তিষ্ককে লড়াই করতে সাহায্য করে এই পুষ্টি উপাদান। লাল চাল, বাদাম, পালং শাক ইত্যাদি হতে পারে দেহের ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদার সমাধান।

প্রোবায়োটিক- সাধারণত যেসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরের জন্য উপকারী, সেগুলোকে প্রোবায়োটিক বলা হয়ে থাকে। দই, ডার্ক চকলেট ইত্যাদিকে বলা হয় প্রোবায়োটিক খাবার। এগুলো পাকস্থলীর উপকারের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলেও জানা গেছে। এসব খাবারে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা বিষণ্ণতা দূর করা ও ‘মুড ভালো’ করার কারণ হিসেবে কাজ করে।

Leave a Reply