পরামর্শ দিয়েছেন

শায়লা সাবরিন
সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান

শেয়ার এবং প্রিন্ট করুন

শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে এই ৫ টি সাধারণ ভুল আপনিও করছেন না তো?

সন্তানকে প্রতিদিনই পর্যাপ্ত খাবার দিচ্ছি কিন্তু আশানুরূপ গ্রোথ হচ্ছে না কিংবা প্রায়ই শিশু অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। শিশুর সঠিক খাবার অভ্যাস ও সুস্থতা নিয়ে প্রায়ই আমরা সব বাবা-মা দুঃশ্চিন্তায় ভুগি। অনেক সময় তাই সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য আমরা এমন অনেক কাজ করি, যা আসলে শিশুর স্বাভাবিক খাবারের অভ্যাস তৈরিতে ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। আজ আমরা আলোচনা করবো, এমনই ৫ টি ক্ষতিকর, ভুল খাদ্যাভ্যাস এবং সেগুলোর প্রতিকার নিয়ে।

১। জোর করে খাওয়ানো:

শিশুরা অধিকাংশ সময় বিভিন্ন খাবার খেতে অনীহা প্রকাশ করে। বিশেষ করে শাক-সবজি খাওয়ার ক্ষেত্রে বাচ্চারা এটা বেশিই করে। পুষ্টির অপূর্ণতা থাকবে এই চিন্তায় বাবা-মায়েরা জোর করে বাচ্চাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে।

অথচ, এই কাজটা শিশুর খাবারের প্রতি আরও অনীহা সৃষ্টি করে। অনেক খাবারই বাচ্চারা প্রথমে খেতে না চাইলেও সময়ের সাথে ধীরে ধীরে তা খেতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু জোর করলে সেই খাবারের প্রতি তাদের অনীহাটা থেকে যায়।

প্রতিকার:

মনে রাখতে হবে যে, শিশুকে খাবার খাওয়ানোর উদ্দেশ্য হলো তার শরীরে পুষ্টি নিশ্চিত করা। শিশু যখন কোনও খাবার খেতে চাইবে না, তখন সেই একই পরিমাণ পুষ্টি বা খাদ্য উপাদানে চাহিদা অন্য কোনও খাবার বা ফলমূল দিয়ে পূরণ করতে হবে। কিংবা শাক-সবজি দিয়ে মজাদার কোন নাস্তা, এমনকি স্মুদি/ জুস করে দিলেও সেখান থেকে বাচ্চা পরিমিত পুষ্টি পেতে পারে।

২। খাবারের সুনির্দিষ্ট রুটিন না থাকা:

অনেক সময় বাচ্চার আবদার রাখতে বাবা-মায়েরা সময়ে অসময়ে বিভিন্ন স্ন্যাক্স বা মুখরোচক খাবার দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই অভ্যাসটা বাচ্চার নিয়মিত খাবারের রুটিন-এ ব্যাঘাত ঘটায়।

শিশুর খাবারের যদি সুনির্দিষ্ট রুটিন না থাকলে, সে প্রতিদিন কি পরিমাণ খাবার খাচ্ছে এবং কতটুকু পুষ্টি পাচ্ছে তার হিসেব থাকে না। এবং যখন খাবারের সঠিক সময় হয়, তখন খেতে চায় না। এছাড়া অনিয়মিত খাদ্য গ্রহণ করলে বাচ্চারা খিদে কিংবা কখন তার খাবার খাওয়া উচিত সেটা বুঝে না। ফলে, ভবিষ্যতেও বিরূপ প্রভাব দেখা যায়।

প্রতিকার:

শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য তাদের খাবারের একটা নির্দিষ্ট রুটিন থাকা জরুরি। তিনবেলা নিয়ম করে তিনটি প্রধান খাবার এবং সেই সাথে অন্তত দুবার হাল্কা নাশতা দিলে প্রতিদিন কী পরিমাণ খাবার সে খাচ্ছে তা জানা যায়। কোন বেলায় পুষ্টিকর খাবার বাদ পড়ে গেলে পরের বেলায় সেই খাবারটা দিয়ে ব্যালেন্স করা যায়।

৩। চকলেট বা মুখরোচক খাবারের প্রলোভন দেখানো:

প্রায়ই সন্তান কিছু খেতে না চাইলে বাবা-মায়েরা তাকে সেই খাবার খেলে পরবর্তীতে তাকে চকলেট/ আইসক্রিম জাতীয় খাবার দেয়ার প্রলোভন দেখায়। আমরা মনে করি কৌশল অবলম্বন করে হলেও বাচ্চা পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে এই ব্যাপারটা ভালো।

কিন্তু এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করলে শিশু পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনা। বরং তারা মনে করে চকলেট/ আইসক্রিম পুষ্টিকর খাবারের চাইতে ভালো খাবার। ফলে সঠিক খাবারের প্রতি তাদের অনীহাটা স্থায়ী হয়ে যায়।

প্রতিকার:

এক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার শর্ত হিসেবে চকলেটের প্রলোভন না দেখিয়ে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার রাখা উচিত। বিভিন্ন ফলমূল, বাদাম দিয়ে স্মুদি বা ডেজার্ট তৈরি করে দেয়া যেতে পারে। দৈনন্দিন খাবার তালিকায় দশ ভাগের এক ভাগ মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং নয় ভাগ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা ভালো। এতে করে শিশু সুস্বাদু খাবারের মজা এবংপুষ্টি একই সাথে পাবে।

৪। শিশুকে স্বাধীন ভাবে খেতে না দেয়া:

অধিকাংশ অভিভাবকই তাদের সন্তানের খাবার নিজেদের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে চান। খাবার খাওয়ার সময় দ্রুত খাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে থাকেন। অনেক সময় দ্রুত খেলে এর বিনিময়ে চকলেট-এর প্রলোভন ও দেন। একেক জন শিশুর শারীরিক গড়ন ও বয়স অনুযায়ী তার খাবারের রুটিন ভিন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু বাবা-মায়েরা প্রায়ই না বুঝে জোর করে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। বেশি খাবার খেলেই সুস্থ থাকা যায়- এই ধারণা ভুল।

সব শিশুই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার খাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্ম নেয়। অর্থাৎ, সে নিজের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ীই খায় এবং খাবে। এটাই প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক। তাই বাবা-মা যখন তার সন্তানের এই খাবার খাওয়ার প্রসেসটা নিয়ন্ত্রণ করতে চান তখন তা শিশুর উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফলে শিশু তার কতটুকু খাবার খেতে হবে সেটার যে স্বাভাবিক বোধের সাথে পরিচিত হতে পারে না।

প্রতিকার:

পৃথিবীর বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার মতে খাবার খাওয়ার এই পুরো ব্যাপারটাই বাবা-মা এবং শিশু দুজনেরই দায়িত্ব। শিশু কখন, কিভাবে, কি খাবে এই দায়িত্ব বাবা-মার উপর থাকুক কিন্তু কতটুকু খাবে তা শিশু নিজেই বুঝে নিবে। এর ফলে শিশুর ভেতর স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠবে।

৫। খাওয়ানোর সময় শিশুর ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইস বা মোবাইলের প্রতি আসক্তি:

বর্তমানে প্রায় সব বাবা-মা ই শিশুকে খাওয়ানোর সময় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের সহায়তা নেন। অর্থাৎ শিশুর হাতে মোবাইল বা ট্যাব ধরিয়ে দেন। শিশুর সম্পূর্ণ মনোযোগ তখন মোবাইলের রাইমস, কার্টুন বা গেইমের দিকে। অভিভাবকরা এই সুযোগের অপব্যাবহার করে সেই মুহূর্তে শিশুকে খাবার খাওয়া। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইস বা মোবাইলের প্রতি আসক্তির এই অভ্যাস শিশুর সাস্থের জন্য হুমকিস্বরূপ। খাওয়ানোর সময় শিশুকে মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ানোর ফলে শিশু কি খাচ্ছে, তার স্বাদ ও টেক্সচার কেমন, কি পরিমান খেলে তার ক্ষুধা মিটবে এই বিষয়গুলির দিকে শিশুর কোন মনোযোগ থাকে না। খাবার খাওয়া যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিশু সেটাই বুজতে পারেনা। যা শিশুর সঠিক খাদ্যাভ্যাসকে ব্যাহত করে।

প্রতিকার:

শিশু যখন ধীরে ধীরে বড় হবে, তাকে পরিবারের সকলের সাথে খাবার টেবিলে অথবা বাচ্চাদের চেয়ারে বসিয়ে সবার সাথে খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে। পরিবারের সকলের সাথে যখন সে খেতে বসবে সবায় তাকে খাওয়া নিয়ে উৎসাহিত করলে শিশুর খাওয়ার প্রতি আগ্রহী হবে, সেই সাথে টেবিলে পরিবেশিত খাবার চিনতে, পছন্দ- অপছন্দ জানতে শিখবে।

Leave a Reply