পরামর্শ দিয়েছেন

চৌধুরী তাসনীম হাসিন
ডায়েটিশান ও নিউট্রিশন স্পেশালিস্ট

শেয়ার এবং প্রিন্ট করুন

বাচ্চাদের ইমিউনিটি ও সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র

বাচ্চাদের শুধুমাত্র শক্তি পেতেই খাবার দরকার হয় না, খাদ্যের মাধ্যমে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ ঘাটতি মেটাতে হয় যাতে দেহের বৃদ্ধি, সুস্থতা এবং স্বাভাবিক ক্রিয়া সচল থাকে । দেহের জন্য অপরিহার্য খাদ্য উপাদানের মধ্যে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ সবচেয়ে বেশি বৈচিত্রপূর্ণ। নানা ধরণের ভিটামিন ও খনিজ দেহে নানা রকমের প্রয়োজনে দরকার পড়ে।
এই ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নাম হলো ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং সেলেনিয়াম। এইগুলি স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে বিভিন্ন রোগ থেকে দেহকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে এবং দেহ গঠনে ও এদের ভূমিকা প্রচুর ।

ভিটামিন-এ:
ভিটামিনের তালিকায় সবার প্রথমে থাকে ভিটামিন এ’র নাম। দেহের জন্য প্রয়োজনীয়তার বিচারেও এটি প্রথম সারিতেই থাকে। দৃষ্টিশক্তি, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দেহের বিভিন্ন তন্ত্রের জন্য এই ভিটামিনকে অপরিহার্য ধরা হয়। ভিটামিন এ সাধারণত দুই ধরণের হয়ে থাকে। ভিটামিন এ এন্টি-ইনফ্ল্যামেশন ভিটামিন হিসাবে পরিচিত কারণ এটি ইমিউন ফাংশন বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের দেহে যেসব কারণে ভিটামিন-এ-র প্রয়োজন:

⦁ অল্প আলোতে কিছু দেখার জন্য চোখের গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখে ভিটামিন এ। রং দেখতে হলেও চোখের জন্য যে উপাদান প্রয়োজন, তার মধ্যে ভিটামিন এ অন্যতম। এছাড়া চোখের বাইরের কর্নিয়া ও কংজাঙ্কটিভা সুরক্ষিত রাখতে এটি সাহায্য করে।

⦁ ত্বক, অন্ত্র, ফুসফুস, মুত্রথলি ও কানের অভ্যন্তরের টিস্যুর রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে ভিটামিন এ’র ভূমিকা।
⦁ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি এটি টি-সেল নামক এক ধরণের শ্বেতরক্তকণিকা তৈরি ও ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে, যা দেহের কোন ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
⦁ এন্টি-ইনফ্ল্যামেশন ভিটামিন যা নানা রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেহকে প্রস্তুত করে।
⦁ এন্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতাসম্পন্ন এই ভিটামিন কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হয়।

ভিটামিন-এ’র অভাবে যা হতে পারে:

⦁ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া ও রাতকানা রোগ
⦁ চোখের শুষ্কতা ও কর্নিয়ায় ইনফেকশন
⦁ চুল ও ত্বকে রুক্ষতা
⦁ নখ ভেঙ্গে যাওয়া
⦁ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া
⦁ শিশুদের দেহের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া

ভিটামিন-এ’র উৎস:
আমাদের পরিচিত নানা ফলমূল, শাকসবজি ও মাছ-মাংস যেমন কলিজা, শাক, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, ফলমূল, ডিম, মাছ-মাংস, দুধ ইত্যাদি থেকেই যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন এ পাওয়া সম্ভব। একটু সচেতনভাবে প্রতিদিনের খাবারের তালিকা সাজালেই এই ভিটামিনের ঘাটতি সম্পূর্ণভাবে পূরণ করা

ভিটামিন-সি:
ভিটামিন সি’কে দেহের সুরক্ষা উপাদান বলা ভুল হবে না। স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে বিভিন্ন রোগ থেকে দেহকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে এটি। এছাড়াও বিভিন্ন শারীরিক ক্রিয়া সচল রাখতে এবং বিভিন্ন তন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো লাগে। বিভিন্ন ফল যেমন বরই, পেয়ারা, আমলকি, আনারস, লেবু, পেঁপে, জাম, লিচু, কামরাঙ্গা, আমড়া, কমলা, টমেটো ইত্যাদি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল দেহের জন্য দরকারী ভিটামিনের যোগান দিতে সক্ষম।  বিভিন্ন শাকসবজি যেমন আলু ও মিষ্টি আলু,, কাঁচামরিচ, ফুলকপি, উচ্ছে, করলা, ব্রকলি, ক্যাপসিকাম, মূলা ও মূলা শাক, সজিনা পাতা, লাউশাক, ধনে পাতা ইত্যাদি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ।

ভিটামিন-সি এর উপকারিতা:
⦁ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে
⦁ খাবার থেকে আয়রন শোষণ করতে সাহায্য করে।
⦁ খাবারের প্রোটিন ভেঙ্গে দেহের শোষণের জন্য উপযোগী করে তুলে।
⦁ দেহের ক্ষত বা ঘা সারাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
⦁ পরোক্ষভাবে দেহে রক্ত উৎপাদন ও রক্তনালী সুগঠিত করে।
⦁ বিভিন্ন প্রদাহ দূর করতে সহায়তা করে।
⦁ এন্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান হিসেবে কাজ করে
⦁ ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যাল’ থেকে কোষকে সুরক্ষিত রাখে এবং দেহে দীর্ঘস্থায়ী রোগ বাসা বাঁধতে দেয় না।
⦁ আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমায়।
⦁ এছাড়াও ভিটামিন সি হৃদরোগ ও কয়েক ধরণের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় বলে গবেষকেরা ধারণা করেন।
⦁ ভিটামিন সি এর অভাবে যা হতে পারে:
⦁ ক্লান্তি ও অবসাদ
⦁ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
⦁ চুল ও ত্বকের রুক্ষতা ও মসৃণভাব হারানো
⦁ মাড়ি ফুলে যাওয়া ও রক্তপাত হওয়া
⦁ দেহের বিভিন্ন জয়েন্টে রক্তক্ষরণ ও তীব্র ব্যাথা
⦁ ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়া
⦁ মেজাজ খিটখিটে থাকা
⦁ হাড় ও পেশির দুর্বলতা
⦁ স্কার্ভি রোগ হতে পারে

সেলেনিয়াম:
দেহে ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম ইত্যাদি খনিজ উপাদানের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায়ই শোনা গেলেও সেলেনিয়ামের কথা ততটা শোনা যায় না। যদিও এটি দেহে খুব অল্প পরিমাণেই দরকার পড়ে, বিভিন্ন শারীরিক প্রক্রিয়ার জন্য এটি অনেকটা অপরিহার্য।

আমাদের দেহে ডিএনএ বিভাজন, থাইরয়েডের হরমোন, প্রজনন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার জন্য দরকার পরে সেলেনোপ্রোটিনের। আর এই সেলেনোপ্রোটিন গঠনের জন্য চাই সেলেনিয়াম। এর অভাবে দেহে বিভিন্ন গুরুতর রোগ বাসা বাঁধারও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

সেলেনিয়াম খুব বেশি পরিমাণে দরকার পড়ে না। তবুও, যতটুকু দরকার তা না পেলে দেহের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সহজলভ্য বিভিন্ন খাবার ডিম, সামুদ্রিক মাছ, লাল চাল, মাশরুম, পালং শাক, ওটস, দুগ্ধজাত খাবার, সুর্যমুখী বীজ ও তেল, সরিষা ইত্যাদি থেকেই প্রয়োজনমতো সেলেনিয়াম পাওয়া সম্ভব।

দেহে সেলেনিয়ামের কাজ: 

⦁ শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্ট: সেলেনিয়াম এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে দেহে সৃষ্টি হওয়া ফ্রি র‍্যাডিক্যা্লদের  সাথে বিক্রিয়া করে সেগুলোকে প্রশমিত করে। এতে করে দেহের কোষ ও তন্ত্র ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়, এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

⦁ থাইরয়েডের জন্য অপরিহার্য: দেহের অন্য সব তন্ত্রের চেয়ে থাইরয়েডেই সবচেয়ে বেশি সেলেনিয়াম থাকে। এটি থাইরয়েড গ্রন্থির ক্রিয়া সঠিকভাবে চালিয়ে নেয়ার জন্য এবং বিভিন্ন ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য দরকারী। এর অভাবে থাইরয়েডে বিভিন্ন রোগের আক্রমণও হতে পারে।

⦁ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে: এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে সেলেনিয়াম। বিভিন্ন প্রদাহ থেকে সুরক্ষা ও রোগ থেকে নিরাপত্তা দেয় এটি। এছাড়া বিভিন্ন রোগ জীবাণুর আক্রমণ টের পেলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন দ্রুত কাজ করে, সেক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে সেলেনিয়াম।

⦁ কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়: এটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সবল করা ও ডিএনএকে রক্ষা করার ভূমিকার কারণে কিছু কিছু গবেষক ধারণা করেন, এটি বিশেষ কিছু ক্যান্সারের কোষ শুরুতেই ধ্বংস করে দিতে পারে। এছাড়া ক্যান্সারের জন্য নেয়া রেডিয়েশন থেরাপির সময় দেহের সেলেনিয়াম বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাব কমায়।

⦁ মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখে: কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার আলজেইমারের মতো বিভিন্ন মানসিক রোগের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম। এছাড়া আলজেইমার রোগীদের স্মৃতি হারানোর হার কমায় এই পুষ্টি উপাদান।

দেহে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে। এদের বেশিরভাগই দেহ নিজে উৎপাদন করতে পারে না। তাই খাবার গ্রহণের সময় সতর্ক থাকতে হবে, সুষম খাবারে যেন বাচ্চাদের দরকারী সব পুষ্টিগুণ থাকে সেদিকে নজর দিতে হবে।

Leave a Reply