পরামর্শ দিয়েছেন

সামিরা খালেক সুকৃতি
চিফ কনসালটেন্ট ডায়েটিশান

শেয়ার এবং প্রিন্ট করুন

প্রিয়জনের সাথেই শুরু হোক আপনার ওজন কমানোর চ্যালেঞ্জ

আজকাল আমাদের কম বেশি সকলের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে অতিরিক্ত ওজন। যা আমাদের শারিরীক ও মানসিক জীবন এ মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আর তাই এই বাড়তি ওজন কমানোর জন্য কিন্তু প্রচেষ্টার ও কমতি নেই। দিনভর চলে নানা ধরনের প্লানিং আর দিন শেষ এ প্রাপ্তিটা যেন শুন্যতার কোঠায় থেকে যায়। ওজন কমানোর জন্য ডায়েট এর ভুমিকা অপরিসীম তা হয়তো আমাদের সকলেরই জানা। মুলত ওজন কমাতে ৮০% ভুমিকা রাখে সঠিক ডায়েট। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ গড়ে তাদের জীবনে ৫৫ বার ডায়েট শুরু করে। আর সেগুলোর বেশিরভাগই নতুন বছরের শুরুতেই শুরু হয়ে কয়েকদিনের মাঝেই মিইয়ে যায়। ঝলমলে সব রেস্টুরেন্ট আর নানা ফুড ডেলিভারি সার্ভিসের অবিশ্বাস্য সব অফারের দায়ে ডায়েট টিকিয়ে রাখা আসলেই বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই একা একা খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ডায়েট শুধুমাত্র ওজন কমানোর একটি উপায় নয়, এটি আসলে এক ধরণের লাইফস্টাইল। ডায়েটের পথে হাঁটতে হলে কম সময়ে ওজন ঝরিয়ে আবার বেশুমার খাওয়াদাওয়ায় ফিরে যাওয়ার মানসিকতা রাখা উচিৎ নয়। বরং পরিমিত খাদ্যগ্রহণ করে এটি সবসময় টিকিয়ে রাখার প্রস্তুতি থাকলেই ডায়েট সফল হয়। ডায়েটকে যখন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই মেনে নিতে হবে, তাই পথচলায় আপনার সাথে আপনার প্রিয়জন থাকলে ব্যাপারটা আর অতটা খারাপ মনে হবে না। বরং একসাথে ক্যালোরি ঝরিয়ে দুজন মিলে ফিট থাকবেন, এবং সুযোগ পাবেন একসাথে ফিটনেসের সুখ উপভোগ করার।

প্লানিংটা শুরু হোক একসাথে:
সে ব্যাপারেও একের প্রতিআপনার প্রিয় মানুষটার সাথে যেহেতু সুখ-দুঃখ সব ভাগ করে নেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন, তাই ডায়েটের মতো (আপাতদৃষ্টিতে) কষ্টের ব্যাপারটি একসাথে ভাগাভাগি করে ভোগ করুন। সফল ডায়েটের শর্ত হলো, হুট করে শুরু করে দেয়া চলবে না। মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি দরকার ঠিকঠাক রসদ জোগাড় করা। আর এই কাজটি ‘তার’ সাথে বাজার ঘুরে করতে পারেন স্বাচ্ছ্যন্দে। ডায়েট চলাকালে কোনভাবেই ক্ষুধার্থ থাকা যাবে না। তাই দিনের নিয়মিত খাবারের সময়গুলোতে কী খাবেন, তা প্ল্যান করে ফেলুন একসাথে। সবারই পছন্দ-অপছন্দের ফলমূল, শাকসবজি বা অন্যান্য খাবার থাকে। তাই আপনার কাছের মানুষের যে খাবারগুলো পছন্দের এবং ডায়েটে থাকাকালীন নির্ভয়ে খাওয়া যায়, তা খুঁজে বের করতে সাহায্য করুন। লিস্ট করে এরপর বেড়িয়ে পড়ুন শপিংয়ে। শপিং শেষে সেই খাবারগুল কীভাবে আরো একটু মুখোরোচক করা যায়, অপরের ভূমিকা থাকতে পারে।

এক্সারসাইজ হোক একসাথে:
ওজন কমানোর বা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য খাদ্যাভ্যাসের যেমন নিয়ন্ত্রণ দরকার, তেমনই দরকার নিয়মিত শরীরচর্চার। কিন্তু দুই একদিন উৎসাহ নিয়ে ব্যায়াম শুরুর পর আগ্রহ হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটি মোটেও আনকমন নয়। তাই, ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও আপনার প্রিয় মানুষের সাথে টিম গঠন করে ফেলতে পারেন। একসাথে একটি ব্যায়ামের রুটিন বানিয়ে ফেলুন, আর ঠিক করুন দিনের কোন সময়টি ঘাম ঝরাতে ব্যবহার করবেন। দুইজনের একজন একটু আগ্রহ হারালেও আরেকজন উৎসাহ দিয়ে ব্যায়ামের রুটিনটি নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারবেন।

ডেটিং হোক ডায়েট ফ্রেন্ডলি:
এই ব্যস্ততার জীবনে ভালবাসার মানুষটার সাথে খানিকটা প্রশান্তির সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন রেস্তোরাঁগুলোতে পাওয়া যায় মনরোম পরিবেশ। আর রেস্টুরেন্টে গেলে ডায়েট ধরে রেখে খাবার অর্ডার দেয়া স্বাভাবিকভাবেই খুব কঠিন। একা ডায়েটে থাকলে অন্যজনের জন্য হলেও আজেবাজে বিভিন্ন কিছু খেয়ে ডায়েটের বারোটা বেজে যায়।দেহে বেড়ে যায় অতিরিক্ত ক্যালরি। কিন্তু দুজনই যখন ডায়েট এ থাকে তবে অর্ডার দেয়ার ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়।কম ক্যালরি যুক্ত খাবার নির্বাচনে আপনার ম্যানু তে রাখতে পারেন স্যুপ,কাবাব, নান,গ্রিলড চিকেন, কিংবা স্টেক, সাথে মজাদার সালাদ খেতে খেতে পার করতে পারেন একান্ত সুন্দর সময়।কোল্ডড্রিনক্স এর বদলে রাখতে পারেন টকদই এর লাসসি ডেজার্টে চিনিযুক্ত খাবার না খেয়ে চুমুক দিতে পারেন চিনি ছাড়া ফ্রেশ ফলের জুসে।
প্রতি বেলার খাবারের খোঁজ নিন
নিয়মিত বিরতিতে পরিমিত খাবার খাওয়াই হলো সফল ডায়েটের মূলমন্ত্র। তাই আপনার ডায়েটসঙ্গী প্রিয় মানুষটি সময়ের খাবার সময়ে খেলো কিনা, তা অবশ্যই খোঁজ নিবেন। না খেয়ে থাকলে খাওয়ার জন্য তাড়া দেয়ার দায়িত্বও তখন আপনার উপরেই।
ফসকে গেলে আঁকড়ে ধরুন:
ডায়েট একটি রুটিন, জীবনের একটি অভ্যাস। কিন্তু সব দিন সময় হয় না। ডায়েট শুরু করলে তা এলোমেলো হয় না, এমন মানুষ একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ডায়েট প্ল্যান থেকে ফসকে গেলেই হতাশা চলে আসে, মনে হয় যেন এতদিনের শ্রম আর সাধনা সব পন্ড হয়ে গেলো। কিন্তু বাস্তবে ডায়েট তেমন নয়। হতাশা ঝেড়ে আবার ডায়েটের রুটিন মেনে ও শরীরচর্চা চালিয়ে গেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে আসতে বাধ্য। আর সে সময়টিতে কাছের মানুষটির অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই আপনার সঙ্গী যদি ডায়েট মিস করে ফেলে, হতাশ হয়ে যায়, তাকে উৎসাহ দিন। আবার পূর্ণোদ্যমে ডায়েটে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করুন। তাহলে হতাশা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে না, আবার শুরু হবে ডায়েটের পথে পথচলা।

চিট ডে উপভোগ করুন একসাথে:
ডায়েট নিয়মিত চালিয়ে গেলে নির্দিষ্ট দিনের বিরতিতে মনের ইচ্ছামতো মুখরোচক খাবার পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতেই পারে। এইরকম খাবার খাওয়ার দিনটি হলো ‘চিট ডে’। মানুষ মাত্রই আশা নিয়ে বাঁচে। তাই চিট ডে’র আশা সফলভাবে আপনার ডায়েট চালিয়ে নেয়ার মোটিভেশন হিসেবে খুবই কার্যকর হতে পারে। আর চিট ডে’তে কী খাবেন, কোথায় খাবেন আর কতটুকুই বা খাবেন- তা আপনার কাছের মানুষকে নিয়েই করতে পারেন। একই দিনে একসাথে চিট ডে পালন করলে দুইজনের মন একসাথে ভালো থাকবে, ডায়েটের স্পৃহাও থাকবে অটল।

তবে একসাথে ডায়েটের সময় কিছু ব্যাপারে সচেতন থাকাও জরুরি। সবার মেটাবোলিজম কিংবা শারীরিক গঠন এক হয় না। মুলত ওজন কমাটা প্রতেকের বয়স,লিংগ,শারিরীক গঠন, পরিশ্রমের হার,বংশগত প্রভাব, পরিবেশ ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। তাই দেখা যেতে পারে, একজনের ওজন আশানরূপ হারে কমলেও আরেকজন ওজনের স্কেলে দাঁড়িয়ে খুশি হতে পারছেন না। এতে সে যেন হতাশ না হয়ে যায়, তাই প্রেরণা জুগিয়ে যেতে থাকুন। মনে রাখবেন, ডায়েট কোন টোটকা নয়, এটি একটি জীবনযাত্রা। আর লেগে থাকলে একসময় ওজন নিয়ন্ত্রণে আসবেই। তাই একসাথে ডায়েট চালিয়ে যান, দেখবেন সফলতা আসবেই। আর এভাবেই অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে সুস্থ ভাবে বেচে আপনার জীবনের আরও অনেকটা পথ পাড়ি দেন আপনার প্রিয়জন কে সাথে নিয়েই।

Leave a Reply