পরামর্শ দিয়েছেন

চৌধুরী তাসনীম হাসিন
ডায়েটিশান ও নিউট্রিশন স্পেশালিস্ট

শেয়ার এবং প্রিন্ট করুন

উজ্জ্বল ত্বক ও চুলের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য

সুস্থ শরীরের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প নেই, তা সবারই কম বেশি জানা। আর শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গটি হলো ত্বক। ত্বক আর চুলের যত্ন নিতে নানা রকমের প্রোডাক্টের ব্যবহার তো আছেই, পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে ফেসপ্যাক, হেয়ার সল্যুশন ইত্যাদির জটিল ফর্মুলার খোঁজে সময় ব্যয় করেন সৌন্দর্য সচেতন মানুষেরা।

কিন্তু উজ্জ্বল ও সুস্থ ত্বকের রহস্য ‘প্রাকৃতিক নির্যাসে ভরপুর’ কৃত্রিম প্রসাধনে নয়, বরং এটি লুকিয়ে আছে আপনার খাদ্যাভ্যাসের মাঝে। ত্বক ও চুলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো দেহের বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই আরো বেশি কার্যকর হতে পারে। নিয়মিত কিছু বিশেষ খাবার খেলে, এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রিত করে আপনি পেতে পারেন সুন্দর ও সুস্থ ত্বক।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনার ত্বক ও চুলের জন্য যত্ন আরো জরুরি হয়ে পরে। এছাড়াও রোদের তীব্রতা, দূষণ ইত্যাদির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বককে বাঁচাতেও সতর্কতা পালন করতেই হবে। কিছু বিশেষ খাবার আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের জন্য অনেক বেশি উপকার করতে পারে।

ত্বক ও চুলের জন্য যা ভালো:
বাদাম: চিনাবাদাম, কাঠবাদামসহ প্রায় সব ধরণের বাদামই ভিটামিন ‘ই’ দিয়ে ভরপুর। রং ফর্সাকারী কিংবা ব্রাইটেনিং ক্রিমের সাহায্য ছাড়াই ভিটামিন ই আপনাকে দিতে পারে উজ্জ্বল ত্বক। এছাড়া চুল পড়া বন্ধে ও রুক্ষতা দূর করতে এর জুড়ি নেই। এর পাশাপাশি বাদামে থাকা ফ্যাটি এসিড ত্বকের সংক্রমণ দূর করতেও ভূমিকা রাখে, ত্বককে শুষ্কতা থেকে রক্ষা করে আর বিভিন্ন এন্টি অক্সিডেন্ট উপাদানগুলো শোষণ করতেও এরা ভূমিকা রাখে।

মাছের তেল: সামুদ্রিক ও অন্যান্য তেলযুক্ত মাছে পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণ ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড। আমাদের দেহ এগুলো তৈরি করতে পারে না, তাই খাবারের উপরেই আমাদের নির্ভর করতে হয়। আর এই এসিডগুলো ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা যেমন একজেমা, ফোলা ভাব ইত্যাদি নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। এছাড়া ত্বককে সতেজ রাখতেও এর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এই ওমেগা-৩ এর অভাবে চামড়ায় রুক্ষতা দেখা যায়। এছাড়াও মাছের তেলে ভিটামিন ই, জিংক ইত্যাদি থাকে।

ডিম: ত্বকের গঠনতন্ত্রে অন্যতম হলো কোলাজেন। আর এই কোলাজেন উৎপাদনে ডিম বিশেষভাবে কার্যকরী। এবং ডিমে থাকা সেলেনিয়াম ত্বককে সূর্যের আলো ও ভাঁজ পড়া থেকে সুরক্ষা দেয়। এছাড়া ডিমের জৈব প্রোটিন চুলকে পুষ্টি যোগায়।
টমেটো: প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি সরবরাহের পাশাপাশি টমেটো আমাদের ক্যারোটিনয়েডের উৎস হিসেবেও বেশ উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, টমেটোতে থাকা বেটা-ক্যারোটিন, লুটেইন ও লাইকোপেন ত্বককে সূর্যের আলোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে সাহায্য করে ও কুঁচকে যাওয়ার প্রবণতা কমায়।
কলা এবং ডাবের পানি: এতে আছে প্রচুর পরিমান পটাসিয়াম যা আমাদের তক্কের ও চুলের পানিশুন্যতা বা শুষ্কতা রোধে সহায়তা করে।
ডার্ক চকলেট: চকলেটপ্রেমীদের জন্য আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে, বেশ কিছু পরীক্ষায় ডার্ক চকলেট খাওয়ার সাথে সাথে চামড়ার রুক্ষতা দূর হওয়া এবং আর্দ্রতা ধরে রাখার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে তার জন্য চিনির আধিক্যবিহীন ডার্ক চকলেট খেতে হবে।
টকদই: টকদইয়ে ভিটামিন বি এর বিভিন্ন প্রকারভেদ পাওয়া যায়। ত্বকের জন্য এর প্রধান ভূমিকা হলো ত্বককে পরিষ্কার রাখা ও ভাঁজ দূর করা। এছাড়া ভিটামিন ডি ত্বককে সূর্যের আলোর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল: রোদে বেশি সময় কাটালে আমাদের ত্বকের কোলাজেন ও ইলাসটিন বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর এই ক্ষতি কাটাতে ভিটামিন সি এর ভূমিকা অনেক। কমলা, মালটা, পেঁপে সহ নানা রকমের ফল থেকে সহজেই ভিটামিন সি আমাদের খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারি।
গাজর: প্রায় সারাবছরই হাতের নাগালে থাকা গাজর চুলের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। গাজরে থাকা ভিটামিন এ মাথার ত্বকে ‘সিবাম’ নামের একটা তৈলাক্ত উপাদান তৈরিতে সাহায্য করে। এটা চুলের গোড়াসহ মাথার খুলির শুষ্কতা রোধে উপকারী।
আমলকী: ত্বকের বলিরেখা ও কালো দাগ দূর করা ছাড়াও, আমলকী ত্বকের প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া ত্বকের ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যুর মেরামতে আমলকি ভূমিকা রাখে। এছাড়া চুলের গোড়া শক্ত করা ও পেকে যাওয়া রোধ করতে আমলকী বেশ কার্যকর। নিয়মিত এটি খেলে চুল প্রাকৃতিকভাবেই মসৃন দেখাবে।
মিষ্টি আলু: মিষ্টি আলুতে থাকা বেটা-ক্যারোটিন এবং এন্টি অক্সিডেন্ট ত্বককে রুক্ষতা ও শুষ্কতার হাত থেকে রক্ষা করে।
পানি: শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো ত্বকের সুস্থ্যতার জন্যও প্রতিদিন অন্তত ২-৬ পানি খাওয়া উচিৎ। পানি শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান ঘামের মাধ্যমে বের করে দেয়। পর্যাপ্ত পানি পেলে ত্বকের কোষে পানি পৌঁছায় এবং ত্বক সজীব দেখায়। পরিমিত পানি খেলে ব্রণের উপদ্রবও কমে।

যা খারাপ:
চিনি: চুলের সুস্থ্যতার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হচ্ছে প্রোটিন। প্রোটিন শোষণের উপরেই নির্ভর করে আপনার চুল কতটা সতেজ থাকবে। কিন্তু চুল এবং প্রোটিনের সম্পর্কে চিনি হলো অনেকটা খলনায়কের মতো। চুলে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন শোষণে বাধা দেয় অতিরিক্ত চিনি। তাই চুল হয়ে যায় রুক্ষ। আর ত্বকের ক্ষেত্রে চিনি কোলাজেনের গঠন নষ্ট করে ও ত্বকের টান টান ভাবও নষ্ট করে দেয়। তাই কোমল পানীয়, আইসক্রিম বা অন্যান্য অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ত্বকের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর।
প্রক্রিয়াজাত শর্করা
লবন:  শরীরে ‘water weight’ ba পানি ধরে রাখার জন্য লবণ দায়ী। খাবারে অতিরিক্ত লবণ খেলে দেহে, বিশেষ করে যেখানে ত্বকের পুরুত্ব কম, সেখানে ফোলা ও রুক্ষ ভাব চলে আসে। তাই চিপস, চানাচুর, ভাজাপোড়া ইত্যাদি অতিরিক্ত লবণ দেয়া খাবার ত্বকের সুস্থ্যতার খাতিরে এড়িয়ে চলতে হবে।
কফি: কফিতে থাকা ক্যাফেইন ত্বককে শুষ্ক করে তোলে এবং ত্বকের বলিরেখা ফুটিয়ে তুলতে শুরু করে।
কেচাপ ও সস: টমেটো বা অন্যান্য সসে থাকে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সোডিয়াম। এছাড়াও কৃত্রিম রঙের ব্যবহারও হয়ে থাকে এইসবে কন্ডিমেন্টে। তাই ত্বকের যত্নে এসব সস এড়িয়ে চলা ভালো।

ত্বক ও চুলের যত্ন নিতে সৌন্দর্য সচেতন হতে হবে না। সবচেয়ে বড় এই অঙ্গ আমাদের দেহের বাকি সব অঙ্গকে ধরে রাখে। তাই এর যত্ন নিতে হবে সবাইকেই। নিয়ন্ত্রিত ও সুষম পরিমাণে খাবার খেয়েই আমরা আমাদের ত্বক ও চুলকে রাখতে পারি সুস্থ।

Leave a Reply